চীনে প্রায় অর্ধেক মার্কিন কোম্পানি ট্রাম্পের শুল্কবিরোধী

রাজনৈতিক টানাপড়েন, স্থানীয় বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং শ্লথ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে ব্যবসা চালানো নিয়ে আস্থার সংকটে ভুগছে চীনে পরিচালিত মার্কিন কোম্পানিগুলো।

রাজনৈতিক টানাপড়েন, স্থানীয় বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং শ্লথ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে ব্যবসা চালানো নিয়ে আস্থার সংকটে ভুগছে চীনে পরিচালিত মার্কিন কোম্পানিগুলো। বিষয়টিকে আরো তীব্র করে তুলেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি। সাংহাই আমেরিকান চেম্বার অব কমার্সের (অ্যামচেম) এক জরিপে দেখা গেছে, পাঁচ বছর মেয়াদে কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক আত্মবিশ্বাস রেকর্ড সর্বনিম্নে নেমে এসেছে। এ অবস্থায় চীনা পণ্যের ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরোপিত সব ধরনের শুল্ক বাতিল চেয়েছে অ্যামচেমের প্রায় অর্ধেক সদস্য। খবর রয়টার্স ও নিক্কেই এশিয়া।

‘চায়না বিজনেস রিপোর্ট’ শীর্ষক বার্ষিক এ জরিপে অংশ নিয়েছে ২৫৪টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ৪৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠান শুল্ক ও অশুল্ক বাধা পুরোপুরি সরিয়ে দেয়ার পক্ষে মত দিয়েছে।

মাত্র ৪১ শতাংশ মার্কিন প্রতিষ্ঠান চীনে পাঁচ বছরের ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি বা সাফল্য নিয়ে আস্থাশীল। গত বছরের তুলনায় এটি ৬ শতাংশীয় পয়েন্ট কম। ১৯৯৯ সালে অ্যামচেমের বার্ষিক প্রতিবেদনে এ জরিপের ফল প্রকাশ শুরু হয়। ওই সময়ের পর থেকে এবারই প্রথম মার্কিন কোম্পানিগুলোয় আস্থায় এত তীব্র সংকট দেখা যাচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্বেগের কেন্দ্র রয়ে গেছে ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি। ৬৬ শতাংশ অংশগ্রহণকারী বলেছেন, আগামী তিন-পাঁচ বছরে ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে মার্কিন-চীন উত্তেজনাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ৬৪ শতাংশের মতে, মার্কিন-চীন শুল্ক চলতি বছরের আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

গত এপ্রিলের শুরুতে চীনের ওপর বড় অংকের রেসিপ্রোকাল ট্যারিফের ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পাল্টাপাল্টি ব্যবস্থায় দুই পক্ষে একে অন্যের ওপর আরোপিত শুল্কহার শতভাগ ছাড়িয়ে যায়। এরপর মে মাসে বাণিজ্য বৈঠকের পর সাময়িকভাবে বড় আকারে শুল্ক কমায় দুই পক্ষ। সর্বশেষ গত মাসে শুল্কবিবাদে স্থগিতাদেশ আরো ৯০ দিন বাড়ানো হয়েছে।

অস্থায়ী বিরতি সত্ত্বেও চীন থেকে আমদানীকৃত পণ্যে ৩০ শতাংশ মার্কিন শুল্ক প্রযোজ্য হচ্ছে, যা দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যে আঘাত হেনেছে। গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রমুখী চীনা রফতানি ২০২৪ সালের আগস্টের তুলনায় ৩৩ দশমিক ১ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে চীনের আমদানি কমেছে ১৬ শতাংশ।

অ্যামচেম বলছে, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্কে এ অস্থিরতা শুধু মার্কিন বাজারে রফতানিকারক নয়, চীনে কার্যক্রম রয়েছে এমন বিদেশী কোম্পানির জন্যও বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

জরিপে অংশ নেয়া প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ প্রতিষ্ঠান বলছে, শুল্ক উত্তেজনা চীনে তাদের আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। কেমিক্যালস, লজিস্টিকস ও শিল্প উৎপাদন খাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে।

অ্যামচেম সাংহাইয়ের প্রেসিডেন্ট এরিক ঝেং জানান, কিছু প্রতিষ্ঠান দ্বিমুখী ক্ষতির শিকার হচ্ছে। কারণ তাদের কাঁচামালের উৎস ও পণ্যের চূড়ান্ত গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র, মাঝে শুধু চীনে প্রক্রিয়াজাত হয়। শুল্কবিবাদে বিরতি প্রসঙ্গে বলেন, ‘৯০ দিনের বিরতিকে আমরা স্বাগত জানাই। কিন্তু এটি এখনো বিদ্যমান সমস্যা। এ অনিশ্চয়তা কোম্পানিগুলোর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে খুব কঠিন করে তুলছে। আশা করি দুই সরকার সমঝোতায় পৌঁছবে।’

এখন মাত্র ১২ শতাংশ প্রতিষ্ঠান চীনকে তাদের প্রধান বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে রেখেছে, যা জরিপের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের অন্যতম যুক্তি ছিল, এতে যুক্তরাষ্ট্রে শিল্পোৎপাদনে আগ্রহী হবে কোম্পানিগুলো। কিন্তু গত এক বছরে ৪৭ শতাংশ কোম্পানি চীনের জন্য বরাদ্দ বিনিয়োগ অন্যত্র সরিয়ে নিলেও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াই ছিল তাদের প্রথম পছন্দ। এ অঞ্চলে বিনিয়োগ সরেছে ৫১ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রকে বেছে নিয়েছে মাত্র ১৮ শতাংশ।

স্থানীয় কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতাও মার্কিনদের জন্য বড় উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। মাত্র দুটি ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রতিযোগীরা পিছিয়ে রয়েছে বলে মনে করছে বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলো। এগুলো হলো পণ্যের গুণগত মান ও পণ্য উন্নয়ন। এছাড়া বিক্রয় ও বিপণন, ডিজিটাল কৌশল, বাজারে প্রবেশের গতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে চীনা কোম্পানিগুলো এগিয়ে রয়েছে।

অবশ্য উদ্বেগ সত্ত্বেও কিছু ইতিবাচক লক্ষণ দেখা গেছে জরিপে। ২০২৪ সালে অ্যামচেমের ৭১ শতাংশ সদস্য চীনে মুনাফায় ছিল, যা ২০২৩ সালের রেকর্ড সর্বনিম্ন ৬৬ শতাংশ থেকে বেশি। আয় প্রবৃদ্ধি ৫০ থেকে বেড়ে হয়েছে ৫৭ শতাংশ। আবার স্বাস্থ্যসেবার মতো কিছু খাত সরকারি ক্রয়ে পূর্বনির্ধারিত মূল্য ব্যবস্থার সুরক্ষা পেয়েছে।

চলতি বছরে চীনে আয় প্রবৃদ্ধি আশা করছে ৪৫ শতাংশ সদস্য। ৩০ শতাংশের ধারণা, আগামী তিন-পাঁচ বছরে চীনের অর্থনীতি বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে যাবে। এ দুটো ক্ষেত্রেই আশাবাদী প্রতিষ্ঠানের হার এখন পর্যন্ত রেকর্ড সর্বনিম্ন।

ইতিবাচক দিক হলো, চীনের নিয়ন্ত্রক পরিবেশকে স্বচ্ছ বলা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা গত বছরের তুলনায় ১৩ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়ে হয়েছে ৪৮ শতাংশ। এছাড়া ৪১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান মনে করছে চীনের নিয়ন্ত্রক পরিবেশ আরো উন্মুক্ত হবে, যা গত বছর ছিল ২২ শতাংশ।

অ্যামচেম সাংহাইয়ের চেয়ারম্যান জেফ্রি লেহম্যান বলেন, ‘চীন সরকার নিয়ন্ত্রক পরিবেশ উন্নয়নের চেষ্টা করছে, কিন্তু সেগুলো মার্কিন-চীন বাণিজ্য উত্তেজনার ছায়ায় ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। স্থিতিশীল ও স্বচ্ছ কাঠামো তৈরি করার জন্য আমরা দুই সরকারকেই আহ্বান জানাই। এ কাঠামো আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্য ও বিনিয়োগকে সহায়তা করবে।’

আরও